নিম্নচাপের প্রভাবে ভোলা, কক্সবাজারের টেকনাফ, বরগুনা, খুলনা, নোয়াখালীর হাতিয়া ও সাতক্ষীরায় আজ শুক্রবারও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে গতকাল বৃহস্পতিবার এসব এলাকার নদ-নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে বেশি মাত্রায় পানি ঢুকেছে এবং জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। এতে পাঁচ জেলার অনেক কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ও হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
ভোলা: নিম্নচাপের প্রভাবে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের মুরাদ-শফিউল্লাহ, নাটোর মিয়ার হাট ও ইলিশা গ্রাম, কাঁচিয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর, শাহমাদার ও কাঁচিয়া গ্রাম এবং ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতুলি ও ধনিয়া গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার এখন পানিবন্দী। দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুর ও সৈয়দপুর ইউনিয়নের প্রায় দুই হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়েছেন।
কাঁচিয়া ইউনিয়নের গুড়া মিয়ার হাটে পুুরান বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অনেক জায়গা জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। ধনিয়া ইউনিয়নের বালিয়াকান্দি গ্রামে নতুন বাঁধের কয়েক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানায়, তাদের বাড়িঘরে সাড়ে চার হাত পর্যন্ত পানি উঠেছে।
ভোলার সদর উপজেলার চেয়ারম্যান ফজলুল কাদের মোল্লা গতকাল সন্ধ্যায় এ সব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, ভোলা শহরকে রক্ষা করতে হলে এ মুহূর্তে সাড়ে চার কিলোমিটার এলাকায় পাকা ফোল্ডার (ব্লক বাঁধ) ফেলা অত্যন্ত জরুরি।
দৌলতখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বিপদগ্রস্তদের উদ্ধার করতে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
টেকনাফ (কক্সবাজার): কক্সবাজারে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিম্নচাপের প্রভাবে উপজেলার ৪২টি গ্রামে জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। এতে ২০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। আজ জোয়ারের পানি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কের ওপর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। যেকোনো সময় জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আ ন ম নাজিম উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বরগুনা: সদরের বুড়িরচর, আমতলীর ঘটখালী, তালতলী থানার তেতুলবাড়িযা, পাথরঘাটার পদ্মা, তাফালবাড়িয়া, বেদাগীর আলীয়াবাদ, সরিষামুড়ি, বামনার কালিকাবাড়ী, রামনা এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশ কিছু অংশ ভেঙে গিয়ে এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে।
নদ-নদীতে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি পানি বৃদ্ধির কারণে আশারচর, নিদ্রা, সখিনা, পদ্মা, লালদিয়া, হরিণবাড়িয়া, রুহিতা, লাঠিমারা, মাঝেরচর, ছোনবুনিয়াসহ জেলার বিভিন্ন চরগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ায় প্রায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। আজও উপকূলের নদ-নদীতে বিপত্সীমার ৩৪ সেন্টিমিটারের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
অস্বাভাবিক জোয়ারে বরগুনা সদর ও তালতলী থানার প্রায় ২০০টি মাছের ঘের ভেসে গেছে। প্রবল বর্ষণ ও জলোচ্ছ্বাসে আমতলী উপজেলার পচাকোড়ালিয়া, মৌপাড়া, গাবতলী, চরপাড়া, জাকিরতবক, হেলেঞ্চাবাড়িয়াসহ প্রায় ১০০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
জেলা ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কেন্দ্রের উপপরিচালক হাফিজ উদ্দীন আহাম্মদ এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন।
খুলনা: জেলার দাকোপ ও কয়রা অঞ্চলে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দাকোপে প্রায় ১৫০টি কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাতিয়া (নোয়াখালী): আজ ও গতকাল জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধ ভেঙে উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সুখচর, নলচিরা, চরঈশ্বর, চারকিং, তমরদ্দি ও সোনাদিয়া ইউনিয়নে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে ।
এলাকাগুলোয় প্রায় ১০ হাজার একর জমির রোপা আউশ ধানের গাছ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানি উঠেছে প্রায় পাঁচ হাজার বাড়ি-ঘরে। এ সব ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ কাঁচাঘর পড়ে গেছে। এ ছাড়া এক হাজার পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ জানান, এ ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা: জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জি এম সফিউল আযম জানান, ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা, নাপিতখালী, চকবারা, খোলপেটুয়া এলাকার আইলায় গৃহহীন প্রায় ৪০০ পরিবার দুর্ভোগে আছে। গাবুরার চকবারা খেয়াঘাট, নেবুবনিয়া ও মধ্যম খোলসেবুনিয়া এলাকায় চিংড়ি চাষের জন্য নদী থেকে পানি তোলার নর্দমা তৈরি করায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের তিন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এলাকার খোলপেটুয়া, চুনকুড়ি মামুদো, ইছামতী ও কপোতাক্ষ নদীর পানির বেড়েছে দুই ফুটের মতো।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. নাছিরউদ্দিন জানান, বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢোকেনি। তবে কয়েকটি স্থানে চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ কেটে ও নর্দমা করে পানি তোলায় বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, ভোলা, হাতিয়া (নোয়াখালী) ও টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি)